দ্বিজাতি তত্ত্ব থেকে লাহোর প্রস্তাব, আর লাহোর প্রস্তাব থেকে একটি রাষ্ট্রের জন্ম — এবং সেই রাষ্ট্রের প্রথম ২৪ বছরে ক্ষমতার ভাগাভাগির একটি প্রায়-ভুলে-যাওয়া হিসাব।
ব্রিটিশ ভারতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও নিখিল ভারত মুসলিম লীগের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে দ্বিজাতি তত্ত্ব — এই যুক্তি যে, হিন্দু ও মুসলিম দুটি পৃথক জাতিসত্তা এবং তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও পৃথক হওয়া উচিত।
এই তত্ত্বের প্রথম আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক রূপ পায় ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ, লাহোরে মুসলিম লীগের অধিবেশনে — যা পরবর্তীতে ইতিহাসে পরিচিত হয় লাহোর প্রস্তাব নামে। মূল প্রস্তাবে মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোকে নিয়ে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম "রাষ্ট্রসমূহ" (বহুবচনে) গঠনের কথা বলা হয়েছিল — একক কোনো "পাকিস্তান" নামের উল্লেখ প্রস্তাবের মূল পাঠে ছিল না।
লাহোর প্রস্তাব যিনি মূল অধিবেশনে উত্থাপন করেন, তিনি ছিলেন এ. কে. ফজলুল হক — তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ও একজন বাঙালি রাজনীতিবিদ। অর্থাৎ যে প্রস্তাব থেকে পরবর্তীতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধারণা দানা বাঁধে, তার প্রকাশ্য রাজনৈতিক মঞ্চায়নে বাঙালি নেতৃত্বের ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়।
সোর্স: উইকিপিডিয়া ↗"পাকিস্তান" ধারণাটি লাহোরে জন্মায়নি একক রাষ্ট্র হিসেবে — জন্মায় বহুবচনে, পরে ইতিহাস তাকে একবচনে নামিয়ে আনে।
লাহোর প্রস্তাব, ২৩ মার্চ ১৯৪০১৯৪৭ সালের ৩ জুন লর্ড মাউন্টব্যাটেনের পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্রিটিশ ভারতকে দ্বিখণ্ডিত করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। ব্রিটিশ ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়সূচি অনুযায়ী, ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ মধ্যরাতে পাকিস্তান একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে — এক দিন পর, ১৫ আগস্ট, স্বাধীনতা পায় ভারত।
নতুন এই রাষ্ট্রের ভৌগোলিক গঠন ছিল নজিরবিহীন: প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার ভারতীয় ভূখণ্ড দ্বারা বিচ্ছিন্ন দুটি অংশ — পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ), যেখানে জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ হন রাষ্ট্রের প্রথম গভর্নর জেনারেল, আর নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান হন প্রথম প্রধানমন্ত্রী — উভয়েই পশ্চিম পাকিস্তান-কেন্দ্রিক রাজনীতির মুখ, যদিও প্রস্তাবের সূচনায় বাঙালি নেতৃত্বের অবদান ছিল অগ্রগণ্য।
প্রস্তাবনায় বাঙালি নেতৃত্ব থাকলেও, রাষ্ট্র গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে বাঙালি ও অবাঙালিদের অংশগ্রহণের সময়কাল ছিল অসম। নিচের রেখাচিত্রে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পুরো সময়টি — কে কতটুকু সময় ক্ষমতায় ছিলেন, তার প্রকৃত অনুপাতে দেখানো হলো।
| নাম | মেয়াদকাল | সময়ের দৈর্ঘ্য |
|---|---|---|
| লিয়াকত আলী খান | ১৯৪৭–১৯৫১ | ~৪ বছর ২ মাস |
| খাজা নাজিমুদ্দিন | ১৯৫১–১৯৫৩ | ~১ বছর ৬ মাস |
| মোহাম্মদ আলী বগুড়া | ১৯৫৩–১৯৫৫ | ~২ বছর ৪ মাস |
| চৌধুরী মুহাম্মদ আলী | ১৯৫৫–১৯৫৬ | ~১ বছর ১ মাস |
| হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী | ১৯৫৬–১৯৫৭ | ~১ বছর ১ মাস |
| আই. আই. চুন্দ্রিগর | ১৯৫৭ | ~৫৯ দিন |
| ফিরোজ খান নুন | ১৯৫৭–১৯৫৮ | ~৯ মাস ২২ দিন |
| নুরুল আমিন | ডিসেম্বর ১৯৭১ | ১৩ দিন |
লাহোর প্রস্তাবের মঞ্চে বাঙালি নেতৃত্ব ছিল সামনের সারিতে, আর জনসংখ্যায়ও পূর্ব পাকিস্তান ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু রাষ্ট্র গঠনের পর ক্ষমতার কাঠামোয় সেই অংশগ্রহণ ধরে রাখা যায়নি — বিশেষত ১৯৫৮ সালের পর দীর্ঘ সামরিক শাসনে।
এই ভারসাম্যহীনতা ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে জমতে থাকা ক্ষোভের একটি স্তর — যা শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে গিয়ে ঠেকে। "মুসলিমদের জন্য এক রাষ্ট্র" ধারণাটি তাই একক জাতীয়তা হিসেবে টেকেনি — ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে ভাষা-সংস্কৃতি ও ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন শেষমেশ বড় হয়ে দাঁড়ায়।