১৪ আগস্ট, ১৯৪৭ — মধ্যরাত

মুসলিমদের জন্য এক ভূখণ্ড: পাকিস্তানের জন্ম

দ্বিজাতি তত্ত্ব থেকে লাহোর প্রস্তাব, আর লাহোর প্রস্তাব থেকে একটি রাষ্ট্রের জন্ম — এবং সেই রাষ্ট্রের প্রথম ২৪ বছরে ক্ষমতার ভাগাভাগির একটি প্রায়-ভুলে-যাওয়া হিসাব।

১৯৪৭

১৯৭১
দুই ভূখণ্ড, একটি রাষ্ট্র, চব্বিশ বছরের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ
নিচে স্ক্রল করুন
০১

দ্বিজাতি তত্ত্ব ও লাহোর প্রস্তাব

ব্রিটিশ ভারতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও নিখিল ভারত মুসলিম লীগের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে দ্বিজাতি তত্ত্ব — এই যুক্তি যে, হিন্দু ও মুসলিম দুটি পৃথক জাতিসত্তা এবং তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও পৃথক হওয়া উচিত।

এই তত্ত্বের প্রথম আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক রূপ পায় ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ, লাহোরে মুসলিম লীগের অধিবেশনে — যা পরবর্তীতে ইতিহাসে পরিচিত হয় লাহোর প্রস্তাব নামে। মূল প্রস্তাবে মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোকে নিয়ে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম "রাষ্ট্রসমূহ" (বহুবচনে) গঠনের কথা বলা হয়েছিল — একক কোনো "পাকিস্তান" নামের উল্লেখ প্রস্তাবের মূল পাঠে ছিল না।

এ. কে. ফজলুল হক
লক্ষণীয়

লাহোর প্রস্তাব যিনি মূল অধিবেশনে উত্থাপন করেন, তিনি ছিলেন এ. কে. ফজলুল হক — তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ও একজন বাঙালি রাজনীতিবিদ। অর্থাৎ যে প্রস্তাব থেকে পরবর্তীতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ধারণা দানা বাঁধে, তার প্রকাশ্য রাজনৈতিক মঞ্চায়নে বাঙালি নেতৃত্বের ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়।

সোর্স: উইকিপিডিয়া ↗

"পাকিস্তান" ধারণাটি লাহোরে জন্মায়নি একক রাষ্ট্র হিসেবে — জন্মায় বহুবচনে, পরে ইতিহাস তাকে একবচনে নামিয়ে আনে।

লাহোর প্রস্তাব, ২৩ মার্চ ১৯৪০
০২

১৯৪৭: বিভক্তি ও একটি রাষ্ট্রের জন্ম

১৯৪৭ সালের ৩ জুন লর্ড মাউন্টব্যাটেনের পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্রিটিশ ভারতকে দ্বিখণ্ডিত করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। ব্রিটিশ ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়সূচি অনুযায়ী, ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ মধ্যরাতে পাকিস্তান একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে — এক দিন পর, ১৫ আগস্ট, স্বাধীনতা পায় ভারত।

নতুন এই রাষ্ট্রের ভৌগোলিক গঠন ছিল নজিরবিহীন: প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার ভারতীয় ভূখণ্ড দ্বারা বিচ্ছিন্ন দুটি অংশ — পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ), যেখানে জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ হন রাষ্ট্রের প্রথম গভর্নর জেনারেল, আর নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান হন প্রথম প্রধানমন্ত্রী — উভয়েই পশ্চিম পাকিস্তান-কেন্দ্রিক রাজনীতির মুখ, যদিও প্রস্তাবের সূচনায় বাঙালি নেতৃত্বের অবদান ছিল অগ্রগণ্য।

০৩

চব্বিশ বছরের ক্ষমতার হিসাব

প্রস্তাবনায় বাঙালি নেতৃত্ব থাকলেও, রাষ্ট্র গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে বাঙালি ও অবাঙালিদের অংশগ্রহণের সময়কাল ছিল অসম। নিচের রেখাচিত্রে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পুরো সময়টি — কে কতটুকু সময় ক্ষমতায় ছিলেন, তার প্রকৃত অনুপাতে দেখানো হলো।

১৯৪৭ ১৯৭১
বাঙালি প্রধানমন্ত্রী
অবাঙালি / পশ্চিম পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী
সামরিক শাসন — কোনো প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না
~৪ বছর ১১ মাস বাঙালি প্রধানমন্ত্রীদের মোট মেয়াদ (৪ জন)
~৬ বছর ৩ মাস অবাঙালি প্রধানমন্ত্রীদের মোট মেয়াদ (৪ জন)
~১৩ বছর সামরিক শাসন, কোনো প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন না
প্রধানমন্ত্রীদের সম্পূর্ণ তালিকা (১৯৪৭–১৯৭১)
নামমেয়াদকালসময়ের দৈর্ঘ্য
লিয়াকত আলী খান১৯৪৭–১৯৫১~৪ বছর ২ মাস
খাজা নাজিমুদ্দিন১৯৫১–১৯৫৩~১ বছর ৬ মাস
মোহাম্মদ আলী বগুড়া১৯৫৩–১৯৫৫~২ বছর ৪ মাস
চৌধুরী মুহাম্মদ আলী১৯৫৫–১৯৫৬~১ বছর ১ মাস
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী১৯৫৬–১৯৫৭~১ বছর ১ মাস
আই. আই. চুন্দ্রিগর১৯৫৭~৫৯ দিন
ফিরোজ খান নুন১৯৫৭–১৯৫৮~৯ মাস ২২ দিন
নুরুল আমিনডিসেম্বর ১৯৭১১৩ দিন

প্রস্তাবনায় কেন্দ্রে, শাসনে প্রান্তে

লাহোর প্রস্তাবের মঞ্চে বাঙালি নেতৃত্ব ছিল সামনের সারিতে, আর জনসংখ্যায়ও পূর্ব পাকিস্তান ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু রাষ্ট্র গঠনের পর ক্ষমতার কাঠামোয় সেই অংশগ্রহণ ধরে রাখা যায়নি — বিশেষত ১৯৫৮ সালের পর দীর্ঘ সামরিক শাসনে।

এই ভারসাম্যহীনতা ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে জমতে থাকা ক্ষোভের একটি স্তর — যা শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে গিয়ে ঠেকে। "মুসলিমদের জন্য এক রাষ্ট্র" ধারণাটি তাই একক জাতীয়তা হিসেবে টেকেনি — ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে ভাষা-সংস্কৃতি ও ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন শেষমেশ বড় হয়ে দাঁড়ায়।

১৪ আগস্ট ১৯৪৭ — ১৯৭১